গোপালগঞ্জের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগুন, ভরসা কেবল ডাল-ডিম


এম আরমান খান জয় :

■ শিম ১৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২৪০ টাকা, টমেটো ১৩০ টাকা ।

■ বেগুন ১০০-১২০ টাকা, ফুলকপি ১৪০ টাকা, পেঁয়াজ ১০০ টাকা ।

■ আলু ৫০ টাকা, পেঁপে ৪৫ টাকা, পটল ৭০ টাকা।

করোনাকালে আয় কমেছে। সঙ্গে ভবিষ্যৎও সুনিশ্চিত নয়। তাই হাত খুলে বাজার করার সুযোগ আর নেই। এর মধ্যে সবজির বাজারের যা অবস্থা, তাতে পকেটে টান পড়ার জোগাড়।

কাঁচাবাজারে এখন মোটামুটি ২০ পদের সবজি বিক্রি হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩টির কেজিপ্রতি দর ৫০ টাকা। এগুলো হলো কাঁচা পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া ও আলু। বাকিগুলো কিনতে লাগবে কেজিপ্রতি ১২০ টাকা পর্যন্ত। ওই তিনটি সবজি যে সস্তা, তা–ও বলা যাবে না।

আমাদের প্রিয় গোপালগঞ্জ একসময় বিভিন্ন কারণে দেশজুরে সুখ্যাতি লাভ করেছিল। কিন্তু সেদিনের সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলায় ভরপুর গোপালগঞ্জ আজ শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। অভাব আর দারিদ্র্যের কশাঘাতে আজকের জনজীবন দুঃখ ও হাহাকারে পূর্ণ। মানুষের ওপর চেপে বসেছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ঘোটক। জীবন ধারণের উপযোগী প্রতিটি জিনিসের অগ্নিমূল্য। চাল, ডাল, মাছ, মাংস, তেল, তরিতরকারি, ফলমূল, চিনি, লবণ, গম, আটা, রুটি, বিস্কুট ইত্যাদি দ্রব্যের মূল্য আগের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।

একদিকে করোনার প্রভাবে কর্মহীন মানুষ অন্যদিকে বন্যায় সবজিতে ব্যাপক ক্ষতি। সব মিলিয়ে কাঁচাবাজারের লাগামহীন মূল্যে নিম্ন আর মধ্যম আয়ের মানুষের জীবন এখন বিপর্যস্ত। সবজি কেনা এখন দুরূহ ব্যাপার। তাই ডাল আর ডিমের ওপরই ভরাসা প্রত্যন্ত এলাকার খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর।

গোপালগঞ্জে বন্যা শুরুর পর থেকেই সবজির বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। কিন্তু গেল দু’সপ্তাহ ধরে সবজির দাম লাগামহীন হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রতিটি সবজি কেজি প্রতি দুই থেকে চারগুণ দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। গত কয়েকদিনের বাজারদর অনুযায়ী কেজি প্রতি চাল ৫৫ টাকা, শিম ১৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২৪০ টাকা, টমেটো ১৩০ টাকা, বেগুন ১০০-১২০ টাকা, ফুলকপি ১৪০ টাকা, পেঁয়াজ ৮০-১০০ টাকা, আলু ৫০-৫৫ টাকা, পেঁপে ৪৫ টাকা, পটল ৭০ টাকা, তিতা করলা ৬০ টাকা। অবস্থান ভেদে এটা আরো বেশি বা কিঞ্চিৎ কম হতে পারে।

উচ্চবিত্তদের খাদ্য তালিকায় তেমন গুরুত্ব না পেলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ঘরে আলুর কদর অনেক। কিন্তু গত কয়েকদিনে সেই আলুর দামই বেড়েছে কেজি প্রতি ১৫-২০ টাকা। নিত্যপয়োজনীয় পণ্যের বাজার যেন লাগামহীন টাট্টুঘোড়া! এক জটিল উভয়সংকটের আকারে দিন দিন বেড়ে চলেছে করোনা মহামারীর প্রকোপ। সংকটের একদিকে ভাইরাস সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকি, অন্যদিকে সেই ঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যে পুরো জাতির অবরুদ্ধ দশার অনিবার্য ফল হিসেবে উদ্ভ‚ত জনদুর্ভোগ। আরেকদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগুন। আর সেই আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষ। উল্লেখ্য, একদিকে যেমন করোনার ভয় ও ঝুঁকি অন্যদিকে পকেট উজাড়, ক্রেতা পড়েছেন মহাসংকটে। ফলে নাভিশ্বাস ওঠা ক্রেতা বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই বাজার সেরে ফিরছেন ঘরে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ক্রান্তিকালে মানুষ যখন চাকরি-বাকরি হারিয়ে কোনোরকম বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে ঠিক তখন চাল, তেল, সবজি, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের।

একের পর জিনিসের দাম বেড়েই চলেছে। কিন্তু আয় বাড়েনি। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, নিম্ন আয়ের মানুষদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিক্রেতাদের গলায় বন্যা আর করোনার অজুহাত। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এসব নিত্যপণ্যের দাম কেন ঊর্ধ্বমুখী- এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, শ্রমিক ও পরিবহন সংকটে পণ্যের সরবরাহ ঘাটতিতে দাম বাড়ছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, অনেক ব্যবসায়ী কারসাজি করে দাম বাড়াচ্ছেন। খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দাবি, করোনার কারণে পণ্য পরিবহনে সংকটের কারণে দাম বেড়েছে। পাইকারদের কাছে মজুদ থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছেন না তারা। এছাড়া পাইকারি পর্যায়ে পণ্য কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। আবার দফায় দফায় বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় বেড়েছে সবজির দামও।

সবমিলিয়ে বাজারে পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। এ কারণেই দাম বাড়ছে। দামের এই নাগাল টানতে হলে উৎপাদন ও পাইকারি পর্যায়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বাড়াতে হবে তদারকিও। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, দেশে পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্যের মজুদ রয়েছে। কিন্তু বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আর নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্বে থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের কোনো তৎপরতাও নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরও তাদের সারাবছরের কার্যক্রমের মতোই গতানুগতিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগের মতো চোখেও পড়ছে না অভিযান। সরকারের প্রচার-প্রচারণা যেমন ক্রেতাদের মজুদ করা থেকে থামাতে পারছে না, তেমনি মূল্য বৃদ্ধিও ঠেকাতে পারছে না।

ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বলগাছাড়া অবস্থা দরিদ্র ব্যক্তিদের পক্ষে বজ্রাঘাততুল্য। বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করছেন। সরকারকে কঠোর হাতে অতিলোভী অসাধু এসব ব্যবসায়ীকে দমন করতে হবে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যতালিকা টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাজারে দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে দেশের সাধারণ মানুষের আরো একটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা প্রদানে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

চলুন এবার দেখে আসি দাম বেড়ে যাওয়ার ক্রেতা বিক্রেতাদের অভিমত :

বাজার করতে আসা মেডিসিন ব্যাবসায়ী প্রান্ত সরদার জানান, বাজারগুলোতে সবধরনের সবজির সরবরাহ নেই। যা আছে সেগুলোর দাম চারগুণ বেশি। আগে এক কেজি কিনলে এখন কিনতে হচ্ছে এক পোয়া।

ক্রেতা নয়ন সিকদার জানান, নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের মানুষের পক্ষে এখন সবজি কিনে খাওয়া স্বপ্নের ব্যাপার। তাই ডিম ডালে দিন চলে যাচ্ছে।

শহরের মহিলা কলেজর ছা্ত্রী ফারজানা আফরোজ জানান, আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি দিয়ে সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় পার করতে হচ্ছে। সবজির বাজারে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আর কাঁচামরিচ কিনে খাওয়ার কথা যেন চিন্তাই করা যায় না।

সবজি বিক্রেতা শুভ্র জানান, বন্যায় গোপালগঞ্জে অধিকাংশ সবজির আবাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জেলার বাইরে থেকে সবজি আনতে হচ্ছে। ফলে দাম একটু বেশি।

সবজি চাষি আসিস জানান, এক বিঘা উঁচু জমিতে লাউ, করলা আবাদ করেছিলাম। বন্যার পানিতে না ডুবলেও বৃষ্টিতে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এতে করলা নষ্ট হয়ে গেছে। লাউয়ের ফলন কিছুটা হলেও আসল মূলধন উঠবে না। বর্তমানে তিনি প্রতি পিস লাউ খেত থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করছেন।

শুধু সবজি নয়, বাজারে এখন চাল, ডাল, ডিম, গরুর মাংস ও আদার দাম চড়া। গত দুই সপ্তাহে নতুন করে বেড়েছে ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের দাম। এত দিন সস্তায় বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়তি। ফলে মানুষের স্বস্তি নেই।