শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খুলে দিতে সমস্যা কোথায়?

এম আরমান খান জয় গনমাধ্যমকর্মী


এম আরমান খান জয় : শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। নিঃসন্দেহে শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। শিক্ষার আলোয় আলোকিত ব্যক্তি এবং জাতি সবসময় উন্নতি ও অগ্রগতির শীর্ষে অবস্থান করে। কিন্তু শিক্ষা তখনই এরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করতে সমর্থ হবে যখন তা হবে উপযুক্ত মানসম্পন্ন। আর এই উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের কাজটি করে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই অবধারিত সত্য হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

বাংলাদেশে করোনাকালে অন্যান্য খাতের মত শিক্ষাখাতও ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার শুরুর দিকে গত ১৭ মার্চ হতে সরকার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। এই পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী তখন হতে ঘরবন্দি, সঙ্গে ছিল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও। এপ্রিলের এক তারিখ হতে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমনা পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তাও সরকারি আদেশে বন্ধ করে দেয়া হয়। বাংলাদেশ জুড়ে প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত (প্রায় পৌনে ছয় কোটি) যে পরিমাণ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে তা পৃথিবীর অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। হঠাৎ করে করোনাভাইরাসের ছোবলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা হতবিহবল হয়ে ওঠে। যেহেতু করোনাভাইরাস অভিজ্ঞতা ছিল বাংলাদেশের জন্য নতুন তাই অন্যান্য খাতের মত এই খাতটিকেও বেশ বেগ পেতে হয় এই সংকট মোকাবিলায়। পরবর্তীতে এই সংকটকে সামনে রেখে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যদিও এই অনলাইন ক্লাসকে ঘিরে কম জল ঘোলা হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশে সব অঞ্চলে ইন্টারনেটের নেটওয়ার্ক সমান শক্তিশালী নয় তাই এই অনলাইন ক্লাস করতে বেশ বেগ পেতে হয় শিক্ষার্থীদেরকে। এছাড়াও নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে নাজিল হয় ইন্টারনেটের মুল্য। এক একটি ক্লাস করার জন্য যে পরিমাণ ডাটা প্রয়োজন সেই পরিমান ডাটা কেনার অর্থ প্রদানের ক্ষমতা বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষার্থীর অবশ্যই নেই। তারপরেও লকডাউনে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে চলছিল এই অনলাইন ক্লাস।

কিন্তু বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্রেক তখনই হয় যখন অন্যান্য খাতকে প্রণোদনা দিয়ে সেইসব খাতের গুরুত্বের কথা চিন্তা করে লকডাউনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেইসব খাতের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে লকডাউন তুলে নিয়ে অফিস-আদালত, বাজার-ঘাট সব উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ শুধু শিক্ষাখাতের বেলায় একের পর এক ছুটির ঘোষণা দিয়ে দায় সারতে থাকেন। এমনকি যখন সিনেমা হল ও বিনোদন কেন্দ্র উন্মুক্ত করার চিন্তা করা হয় তখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর সেই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেয়া ছুটি বৃদ্ধির খড়গ ঝুলতে থাকে এবং কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় শিক্ষার্থীর করোনাকালিন নিরাপত্তার কথা।

স্বভাবতই এমন অর্বাচীনসুলভ সিদ্ধান্তের ফলে যে প্রশ্নগুলো মাথায় আসে তা হলো পৃথিবীর কোনো গবেষণাপত্রে এমন কোনো প্রমান কি পাওয়া গেছে যে করোনাভাইরাস শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই বিস্তার লাভ করে? তা না হলে বার বার করোনাভাইরাস বিস্তারের দোহাই দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ রাখা হচ্ছে? যে দেশে শপিং মল, গণপরিবহন, দূর পাল্লার পরিবহন, অফিস-আদালত, বাজার-হাট সবকিছু খুলে দেয়া হয়েছে সেখানে আসলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে কিভাবে করোনাভাইরাস বিস্তার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি সুরাহা করা কঠিন তা হল একজন শিক্ষার্থী কিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে শুধু ঘরে অবস্থান করে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকবে যেখানে তার পিতা কিংবা মাতা অথবা পিতা-মাতা উভয়কেই জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বাইরে যেতে হচ্ছে। তারা হয়তো গণপরিবহনে গাদাগাদি করে কর্মস্থলে যাচ্ছেন এবং কর্মস্থলে কাজ শেষে আবার বাসায় ফিরে আসছেন। একই ঘরে অবস্থান করা শিক্ষার্থী তার পিতা-মাতার মাধ্যমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? আর বিষয়টি যদি হয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাহলে তো স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খুলে দিতে সমস্যা কোথায়?
সমাজ জীবনে সব জায়গায় স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনে শিক্ষার্থীদেরকে কিভাবে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব? শিক্ষার্থীরা কি সমাজের বাইরে বসবাসরত কোনো গোষ্ঠী?

এবার একটু ভাবার চেষ্টা করি যে এই শিক্ষার্থীরা আসলে এই আপদকালীন ব্যবস্থা তথা অনলাইনের ক্লাসের ফলে কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তাদের ব্যবহারিক কোনো ক্লাস কিংবা পরীক্ষা কোনোটি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহারিক ক্লাস কত গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে বিশেষণ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বলা হচ্ছে এই ব্যবহারিক ক্লাস পরে নেবার কথা। বন্ধের গ্যাঁড়াকলে জমে থাকা ব্যবহারিক ক্লাস এবং বন্ধ শেষ হবার পর যে নতুন সেমিস্টারের ব্যবহারিক ক্লাস মিলে যে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হবে সেই অবস্থায় শিক্ষার্থীরা আদতে যে কী শিখতে পারবে তা তো কেবল বিধাতাই জানেন!

এ তো গেল ব্যবহারিক ক্লাসের কথা, এবার আসি অনলাইনের ক্লাসের নামে যে ক্লাস করানো হয় সেই বিষয়ে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে শিক্ষার্থীর বাস সে দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে একটি অনলাইন ক্লাসের কতটুকুই বা শুনতে পাচ্ছে? একজন শিক্ষার্থী যদি তার ক্লাসের লেকচার ঠিকমতো শুনতেই না পারে তবে সেই ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা কী? এরপর আশা যাক অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া প্রসঙ্গে। অনলাইনে নেয়া পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ কিভাবে সম্ভব? শিক্ষক একটি প্রশ্ন অনলাইনে আপলোড করে দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা সেই প্রশ্ন ডাউনলোড করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর লিখে শিক্ষকে ফেরত দিচ্ছেন। এখন সেই প্রশ্ন পেয়ে আসলে কী বই দেখে লেখা হয়েছে নাকি না দেখে? শিক্ষার্থী নিজে লিখেছে নাকি অন্য কারো সাহায্য নিয়েছে? অনলাইন পরীক্ষায় এই বিষয়গুলোর উত্তর জানা সম্ভব না তথা অনলাইনে নেয়া পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। তাহলে স্বাভাবতই প্রশ্ন জাগে এই মানহীন পরীক্ষার মূল্য আসলে কতটুকু? নিঃসন্দেহে বলা যায় আপদকালীন ব্যবস্থা তথা অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা যত বেশি প্রলম্বিত হবে শিক্ষাব্যবস্থায় ততবেশি গভীর ক্ষত সৃষ্টি হবে।

সবশেষে বলতে চাই, শিক্ষাখাতের ক্ষতি হয়তো অন্যান্য খাতের মতো নগদ মূল্য দিয়ে পরিমাপ সম্ভব নয় কিন্তু তারমানে এই নয় যে এই খাতের গুরুত্ব কোনো অংশে কম। বরং এই খাতে বিন্দুমাত্র চিড় ধরলে তা জাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। জাতি হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলব। তাই শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কথা অনুধাবন করে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিৎ স্বাস্থ্যবিধি মেনে অন্যান্য খাতের ন্যায় শিক্ষাখাতেও স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া।