অভিযোগ নিষ্পত্তির পর জেলা কমিটি অনুমোদন

অনুমোদনের জন্য জমা দেয়া যেসব জেলা কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে সেগুলো নতুন করে গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে কোনো সাংগঠনিক জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ‘মাইম্যান কমিটি’ না করে সব পক্ষের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

শনিবার সকালে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় শেখ হাসিনা এসব নির্দেশনা দেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলোচনায় ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালী, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, সিলেট জেলা ও মহানগর, হবিগঞ্জ, রাজশাহী জেলা ও মহানগরসহ অন্তত ২৫-২৮টি জেলার প্রস্তাবিত কমিটিতে দুর্দিনের নেতাদের বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো কমিটিতে বিএনপি-জামায়াত ও অন্য দল থেকে আসা লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো কমিটিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করা পেশাজীবীদের জায়গা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আট বিভাগে আওয়ামী লীগের আটটি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। টিমগুলো এখন থেকে বিভাগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধান করবে। সভায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই ঘোষণা দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। কয়েকজন সাংগঠনিক সম্পাদক তাদের বিভাগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও কমিটির বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। সম্পাদকমণ্ডলীর কয়েকজন সদস্য তাদের কর্মকাণ্ডের কথা আওয়ামী লীগ সভাপতিকে অবহিত করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সভার শুরুর দিকেই বেশ কয়েকটি জেলার প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। ওইসব জেলায় আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাদের বাদ দিয়ে কোথাও জামায়াত-বিএনপির সাবেক নেতাদের স্থান দেয়া, কোথাও দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। এ সময় অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা কমিটিগুলো ফেরত দিয়ে সেগুলো থেকে অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে নতুনভাবে কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে কথা বলেন দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রস্তাবিত কমিটিতে সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও বেশকিছু সম্পাদকীয় পদে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তারা অনেকেই ঢাকার ভোটার নন। ভোটের সময় তাদের পাওয়া যায় না। নিজ নিজ এলাকায় চলে যান। এতে করে ভোটের সময় সংকট সৃষ্টি হয়। কমিটিতে ঢাকার ভোটারদের প্রাধান্য দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, স্থানীয় ও ত্যাগীদের দিয়ে কমিটি করতে হবে। অনেক জেলায় সমস্যা রয়েছে। সেগুলো দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে হবে। নিজের নেতার মাইম্যান বা এমপিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কমিটি করা যাবে না।

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ঢাকা বিভাগের আওয়ামী লীগের নাজুক অবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল বিভাগ এটি। বিশেষ করে ঢাকা শহরে বেশি সমস্যা রয়েছে। কোনো একটি থানায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সভাপতি সম্মেলন ছাড়া কমিটি গঠন করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করতে হবে।

দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের বিগত কমিটির নেতাদের ডেকে পাননি বলে জানান। তিনি বলেন, তাদেরকে বারবার ডাকলেও সাড়া দেয়নি। সে কারণে প্রতিটি থানায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে কে কোথায় কী সমস্যা ফেস করছে, সেটা আমাকে অবহিত করবে। আমি চাই তৃণমূলে দলের পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীসহ সমাজে যারা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষজন আছেন তাদেরও দলে টানতে হবে।

করোনাভাইরাসের কারণে সীমিত পরিসরের এ সভায় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৩৩ জনকে ডাকা হয়। যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের প্রত্যেকের করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল আসার পরই সভায় যোগদানের অনুমতি পান। যারা করোনা আক্রান্ত আছেন বা ছিলেন, যাদের পরিবারের সদস্যরা করোনা আক্রান্ত তাদের বৈঠকে ডাকা হয়নি। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের পরের সভায় করোনা পরিস্থিতি থাকলে এবারে যারা আমন্ত্রণ পাননি তাদের প্রাধান্য দেয়া হবে বলে জানান শেখ হাসিনা।

‘মাই ম্যান’ কমিটি গঠন করা যাবে না : এদিকে বৈঠক শেষে বিকালে সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সাংগঠনিক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দুর্দিনের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও নিবেদিত নেতাকর্মীরা যাতে বাদ না পড়েন সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। কমিটিগুলোতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হলেই নিজেদের লোক দিয়ে ‘মাই ম্যান’ (নিজস্ব বলয় সৃষ্টির জন্য) কমিটি গঠন করা যাবে না, কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ও পরীক্ষিত নেতাদের কমিটিতে রাখতে হবে বলে জানান ওবায়দুল কাদের। কোনো অবস্থাতেই দলের অভ্যন্তরে বিতর্কিতদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। তৃণমূলের সব কমিটি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে গঠন করতে হবে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হলে মাঠের লোকরাই নেতা হবেন। আর সম্মেলন ছাড়া কমিটি হলে লবিংয়ে বা তদবিরের লোক নেতা হয়।

আটটি সাংগঠনিক বিভাগীয় টিম গঠন : বৈঠকে দেশের আটটি সাংগঠনিক বিভাগের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্যদের সমন্বয়ে ৮টি টিম গঠন করা হয়। গঠিত কমিটিতে ঢাকা বিভাগে টিম সমন্বয়ক ডা. দীপু মনি ও মির্জা আজম। এছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, আবদুল মান্নান খানসহ সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যসহ ১৭ জন এখানে কাজ করবেন।

ময়মনসিংহের টিম সমন্বয়ক ডা. দীপু মনি ও শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। এ বিভাগে প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরীসহ আরও চারজন রয়েছেন। সিলেট বিভাগে টিম সমন্বয়ক মাহবুবউল আলম হানিফ ও সাখাওয়াত হোসেন শফিক। এছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও নুরুল ইসলাম নাহিদসহ আরও দুই সদস্য রয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে টিম সমন্বয়ক মাহবুবউল আলম হানিফ ও আহমদ হোসেন। এছাড়াও এ বিভাগে প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, আবদুল মতিন খসরুসহ ১৩ জন রয়েছেন।

বরিশাল বিভাগে টিম সমন্বয়ক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও আফজাল হোসেন। এছাড়াও আবুল হাসনাত আবদুল্লাহসহ ৫ জন বরিশাল বিভাগে কাজ করবেন। রংপুর বিভাগে টিম সমন্বয়ক ড. হাছান মাহমুদ ও আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। এছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন ও শাজাহান খানসহ ৫ জন কাজ করবেন। রাজশাহী বিভাগের টিম সমন্বয়ক ড. হাছান মাহমুদ ও এসএম কামাল হোসেন। এছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমানসহ ৫ জন কাজ করবেন। খুলনা বিভাগের টিম সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্বে পেয়েছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও বিএম মোজাম্মেল। প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ ও পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্যসহ ৬ জন রয়েছেন এ বিভাগের টিমে।