স্বাধীনতার ৫০ বছর পর হঠাৎ করে জাতির জনকের ভাস্কর্য নিয়ে কথা উঠলো কেন?

লিখেছেন : শফিকুর রহমান টুটুল (চেয়ারম্যান গোবরা ইউপি,গোপালগঞ্জ)

বিগত বেশ কিছুদিন যাবত দেশে ভাস্কর্য নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। ইউটিউবে বিভিন্ন আল্লমা,মুফতী, মাওলানা সাহেবদের ওয়াজও খুব খেয়াল করে দেখছি। ওনারা বিজ্ঞজন ভালো ভালো যুক্তি দিয়ে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। যারা ওয়াজ শুনতে যাই জেহাদী জজবা’য় পারলে তখনই বাংলাদেশের সকল ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলি। আর যারা এফবি একটিভিস্ট তারা এফবি ফাটিয়ে ফেলছি।তবে ভাঙ্গার পক্ষের ফাটানো খুব জোরেশোরে ফাটছে। রাখার পক্ষের কথা বিড়ালের মিউ মিউ এর মত মনে হচ্ছে। খাঁটি আওয়ামীলীগার, পরনে কেতাদুরস্ত মুজিব কোট,মুখে জয়বাংলা, খাতায় বড় পদে নাম, মঞ্চে সামনের কাতারে আসন কিন্তু এখানে মিউ মিউ ?

“হায়রে আমার সোনাফলা মাঠে রূপ দেখে তোর কেন আমার পরান ভরে না”

কি বলবো। “বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ”
কোথায় সব মুজিব পাগল সৈনিক? ভাস্কর্য ভাঙ্গার বিরোধীরা শক্ত যুক্তি তুলে ধরে একটা তুমুল সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেন গড়ে তুলছেন না ? শুধু কাউকে গালি দিলেই কি ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন দমে যায় ? শক্ত যুক্তি কোথায়? আলেম সমাজতো যুক্তি দিচ্ছেন। আপনি খন্ডাচ্ছেন কি দিয়ে? আসুন কি কি যুক্তি যুক্ত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করি।

* আজ এতদিন পর হঠাৎ করে ভাস্কর্য নিয়ে কথা উঠলো কেন? কারা উঠালো? এটা কি সুচিন্তিত?

* ভাস্কর্য আর মূর্তি যে এক নয় তা আমরা জানি।ভাস্কর্য একটা শিল্প। শুধু শিল্পই নয় একটা দেশের কৃষ্টি কালচার সভ্যতার আর ইতিহাসের অমোঘ নিদর্শন ভাস্কর্য। বিশ্ব বরেন্য মনীষী, দেশপ্রেমিক নেতা, বীরযোদ্ধা , এঁদের ভাস্কর্য যুগে মানুষ বানিয়েছে। আমাদেরকে বিভিন্ন সভ্যতার মুখোমুখি করেছে।ইতিহাসের সাথে পরিচিত করিয়েছে। আর মূর্তি(প্রতিমা) সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করার জন্য তৈরী করেন। সেটার আবেদনও আলাদা। সুতরাং এই বিতর্ক এখন কেন?

* আমাদের দেশের আলেম সমাজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট মুল্যায়ন করেন।তিঁনি আলেম সমাজের অনেক দাবী মেনেও নিয়েছেন। হেফাজতে ইসলামের দাবী মেনেই তিঁনি হাইকোর্টের সামনের ভাস্কর্য সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তখন কি বাংলাদেশে জাতির পিতার ভাস্কর্য ছিল না? স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে জাতির জনকের ভাস্কর্য নিয়ে এখন বিতর্ক তোলার উদ্দেশ্য কি?

* বাংলাদেশে কি শরীয়া আইন চালু আছে? এখানে স্বাধীন ভাবে ভাস্কর্য শিল্প বিকাশে সরকার কি বাঁধা দিতে পারে? কিংবা কেউ যদি বাঁধা দেয় সেটা কি দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী নয়?

* জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙ্গার আন্দোলন বাংলাদেশে কি টিকবে? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের স্বরূপ। তার ভাস্কর্য নিয়ে কোন কথা কি স্বাধীন, সেকুলার বাংলাদেশে উত্থাপিত হতে পারে? হলে সেটা কি সংবিধান পরিপন্থী নয়? কারন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান জাতির পিতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

প্রাচীন যুগেও মূর্তির বহুল প্রচলন ছিলো। কা’বা ঘরের সব মূর্তি মক্কা বিজয়ের পর হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর নির্দেশে ভেঙ্গে ফেলা হয়।তখন এক সাহাবি মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মূর্তিটা না ভেঙ্গে মহানবীর (সঃ) এর কাছে এসে বলে যে হুজুর ইব্রাহিম (আঃ) তো আমাদের জাতির পিতা ওনার মূর্তিটা রেখে দেই? কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সঃ) সরাসরি বললেন না তারটাও ভেঙ্গে ফেল। সাহাবীরা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং ঈসমাইল (আঃ) মূর্তি সরানোর সাহস করতে না পারলে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) স্বয়ং মূর্তি নিয়ে আসেন এবং হযরত আলী (রাঃ) দিয়ে ঐ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন।

এখানে কথা হলো ঐ মূর্তিগুলি বানানোই হয়েছিলো পূজা করার উদ্দেশ্যে। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে মসজিদের সামনেও তাদের বীর নেতার ভাস্কর্য স্থাপিত আছে।মুসলিমরা ঐ মূর্তির সামনে দিয়ে গিয়ে আল্লাহর ঘরে আল্লাহর এবাদত করেন।পিছনে রেখে আসা ভাস্কর্যকে নয়। বর্তমান যুগে ভাস্কর্য একটা শিল্প, একটা আর্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে কোন ধর্মীয় ব্যাখ্যা থাকলে আমি অনুরোধ করবো আপনারা যে যে হাদিসের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন সেটা দিয়ে মাঠের জজবাতি সৃষ্টি না করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সময় চান। কোন এক সুবিধাজনক সময়ে তাঁর সাথে বসুন। সবাই সবার যুক্তি তুলে ধরে একটা এমন স্পেস বের করুন যেখান থেকে সবাই সবার বুঝ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন।

কিন্তু স্বাধীনতার এই প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পর একটা নতুন ইস্যু সৃষ্টি করলে দেশটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।এমনিতেই করোনা মোকাবিলায় সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।আমাদের সামনে এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আমরা এখনও স্কুলে পাঠাতে পারছি না। মাদ্রাসাগুলোও সচল হতে পারছে না। আসুন সঠিক জায়গায় কথা বলবার চেষ্টা করি।মাহফিলে এসে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে কোন অস্থিতিশীলতা নয়। এতে করে আপনাদের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে দেশের বড় একটা অংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে বৈকি।বাঙ্গালী জাতি হিসেবে তাতে আমরা আরো পিছিয়েই যাবো শুধু এগোতে পারবোনা এক পা’ও।