কোনবা পথে পদ্মা সেতু যাই !!

মহাসড়কের গাড়িতে বাড়বে ঢাকার যানজট

বাস্তবের পথে স্বপ্নের পদ্মা সেতু

বিশেষ প্রতিনিধি : আল-আমীন ইসলাম ।- পদ্মা সেতু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী চাহিদা। প্রথম থেকেই পদ্মা সেতু নিয়ে বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র ছিল। বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের কেউ কেউ এই সেতু নির্মাণে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে বিশ্বব্যাংক প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ঋণ অনুমোদন করতে অস্বীকার করে। ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট একনেকের বৈঠকে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নির্মাণব্যয় সংশোধন করে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার টাকা ধরা হয়। এতে অর্থায়নের জন্য ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় চারটি দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে। এগুলো হলো দাতা চুক্তি স্বাক্ষর পরিমাণ (মার্কিন ডলারে) WB ২৮ এপ্রিল ২০১১ ১২০ কোটি, ADB ৬ জুন ২০১১ ৬২ কোটি, JICA ১৮ মে ২০১১ ৪০ কোটি, IDB ২৪ মে ২০১১ ১৪ কোটি মোট ২৩৬ কোটি (মার্কিন ডলার)। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। কিন্তু দাতাগোষ্ঠীগুলো পদ্মা সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৩ সালে ঋণ চুক্তি বাতিল করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ করছে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্গত একটি নদীমাতৃক দেশ। শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পদ্মা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান নদী। বিশ্বে আমাজন নদীর পরই দীর্ঘতম ও খরস্রোতা নদী হচ্ছে পদ্মা। এই নদীর গভীরতা ও স্রোতের প্রখরতা জয় করে শুরু হয়েছে সেতু নির্মাণের কাজ।

এটি হিমালয়ে উত্পন্ন গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী, যার সর্বোচ্চ গভীরতা ১ হাজার ৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট (২৯৫ মিটার) আর দৈর্ঘ্যে ১২০ কিলোমিটার। এই নদীর দুই পারে অনেক সুবিধাবঞ্চিত বিস্তীর্ণ জনপদ। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতু স্বপ্ন হয়ে ছিল এতদিন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে।

আর এই স্বপ্ন পূরণে পদ্মা নদীতেই নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের তথা দক্ষিণবঙ্গের স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু হচ্ছে। আগামী বছর দেড়েকের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি শতকরা প্রায় ৯১ ভাগ। সার্বিক অগ্রগতি ৮২ শতাংশ। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেতুতে গাড়ি যাওয়ার সহজ পথ নেই। রাজধানীকে ঘিরে সার্কুলার রুট নির্মাণের বহু পুরনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শহরের ভেতর প্রবেশ না করে মহাসড়কের যানবাহন পদ্মা সেতু ব্যবহার করতে পারত।

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণবঙ্গমুখী যানবাহন চলাচল বাড়বে। এসব গাড়িকে ঢাকার ভেতর দিয়ে যেতে হলে রাজধানীর অসহনীয় যানজট আরও বাড়তে পারে। অথচ ঢাকাকে ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা এতদিনে বাস্তবায়িত হলে এ বিড়ম্বনায় পড়ার শঙ্কা ছিল না। বর্তমান অবস্থায় গাবতলীর গাড়ি পদ্মা সেতু ব্যবহার করে দক্ষিণবঙ্গ যেতে চাইলে যানজটে ভরা রাজধানীর ভেতর দিয়ে যেতে হবে। একই অবস্থায় পড়তে হবে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহের মহাসড়কের দক্ষিণবঙ্গমুখী যানবাহনকেও।

পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে ঢাকার ধোলাইপাড় থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। কিন্তু রাজধানীতে প্রবেশ না করে দেশের অন্য মহাসড়কের যানবাহনের এক্সপ্রেসওয়ের যাওয়ার পথ নেই। পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-ময়মনসিংহের গাড়িকে যানজটে পূর্ণ রাজধানী পেরিয়ে পোস্তগোলা বা বাবুবাজার সেতু হয়ে ঢাকা-মাওয়ায় যেতে হবে। অথচ সার্কুলার রুট হলে অনায়াসে আবদুল্লাহপুর দিয়ে সার্কুলার রুট ধরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যাওয়া যেত। যদিও ২০০৪ সালেই বলা হয়েছিল ঢাকা ঘিরে বৃত্তাকার সড়কপথ নির্মাণের।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালে সরকারের সংশোধিত এসটিপিতে (আরএসটিপি) ঢাকাকে ঘিরে তিনটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে, যা দুই বছর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এর পর চার বছর কেটে গেলেও সার্কুলার রুট পরিকল্পনায় রয়ে গেছে।

পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বছর দেড়েকের মধ্যে মূল সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাবে। তবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানিয়েছে, এখনই শুরু

করা গেলেও কমপক্ষে চার বছর লাগবে ইনার সার্কুলার রুটের গাবতলী থেকে কদমতলী অংশের কাজ শেষ করতে। এ অংশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ককে কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে যুক্ত করবে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে। রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ধরে গাবতলী থেকে বসিলা, হাজারীবাগ, সোয়ারীঘাট হয়ে কদমতলী অংশে সড়ক নির্মাণের পর উত্তরবঙ্গের গাড়ি শহরে প্রবেশ না করেই পদ্মা সেতুতে যেতে পারবে। গাবতলী থেকে চলা বাসগুলোও একই অসুবিধা পাবে।

সওজ জানিয়েছে, ঢাকা শহরকে ঘিরে ৮৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনার সার্কুলার রুট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দুটি ভাগে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ইনার সার্কুলার রুট ফেইজ ১-এর আওতায় আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে তেরমুখ, পূর্বাচল, বেড়াইদ, ডেমরা পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে নতুন করে এই অংশে সড়ক নির্মাণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

অন্যদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী, আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর, বিরুলিয়া, গাবতলী, বসিলা, হাজারীবাগ, সোয়ারীঘাট, কদমতলী, তেঘরিয়া, পোস্তগোলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া, শিমরাইল হয়ে ডেমরা পর্যন্ত ৬৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে ইনার সার্কুলার রুট ফেইজ ২-এর আওতায়। এখানে আগে থেকেই সড়ক বিদ্যমান রয়েছে, যা প্রশস্ত করতে হবে। তবে সাকল্যে সড়ক নির্মাণ করতে হবে ৪৭ দশমিক ১৪৭ কিলোমিটার। কারণ তেঘরিয়া থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত সাড়ে আট কিলোমিটার পথ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের অংশ। আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর পর্যন্ত আট কিলোমিটার পথ সেতু কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায়। অবশিষ্ট ৪৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ১২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করে প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সওজ।

সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অগ্রাধিকার পাচ্ছে সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ গাবতলী থেকে কমদতলী অংশ। ১৯৮৭ সালে আবদুল্লাহপুর থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা বেড়িবাঁধ নামে পরিচিত। এর ওপর বর্তমানে দুই লেনের সড়ক রয়েছে। দুই পাশে বাঁধের জমি রয়েছে।

সওজের প্রধান প্রকৌশলী কাজী শাহরিয়ার হোসেন বলেন, রাজধানীজুড়ে সার্কুলার রুট নির্মাণ করা হবে। যাতায়াত সহজ করতে এটি দরকারি উদ্যোগ। ইতোমধ্যে ইনার সার্কুলার রুট ২-এর ফিজিবিলিটির কাজ শেষ হয়েছে। অন্যান্য অংশের কাজও এগোচ্ছে।

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও ঢাকা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সবুজ উদ্দিন খান বলেন, প্রকল্পের ফেইজ-২ অংশের সোয়ারীঘাট-কদমতলী অংশের অর্থায়নে আইআইবিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখনো জবাব আসেনি। বাকি অংশ নিজস্ব অর্থায়নে করার চিন্তা। তিন-চার মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হবে।

সওজ সূত্র জানায়, ইনার সার্কুলার রুট ২-এর গাবতলী থেকে কদমতলী অংশের বিস্তারিত নকশা হয়েছে। বিদ্যমান বেড়িবাঁধে এ সড়ক করা হবে। জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা নেই। এ অংশে সোয়ারীঘাট থেকে কদমতলী পর্যন্ত বড় একটি সেতুর পরিকল্পনা থাকায় বিনিয়োগের জন্য এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (আইআইআইবি) কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ সরকারি অর্থায়নে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সওজের ঢাকা জোনের কর্মকর্তারা জানান, সোয়ারীঘাট থেকে বাবুবাজার সেতু পর্যন্ত অংশ সরু। এর পর সদরঘাট। এখান দিয়ে সড়ক নির্মাণ করলে বহু স্থাপনা ভাঙা পড়বে। তাই সোয়ারীঘাট থেকে কেরানীগঞ্জের কদমতলী পর্যন্ত সেতু নির্মাণ করা হবে। এখানে ঢাকা-মাওয়ার সঙ্গে যোগ হবে সার্কুলার রুট। তবে এখনো সেতুর বিস্তারিত নকশা হয়নি। সড়ক যেখানে সরু এমন কয়েকটি অংশ এলিভেটেড হবে। এ সড়ক হলে গাবতলীর গাড়িকে ঢাকায় ঢুকতে হবে না। উত্তরবঙ্গের গাড়িও এ পথে পদ্মা সেতুতে যেতে পারবে।

সওজ পরিকল্পনায় শেষ করলেও আসল কাজ শুরুর বহু ধাপ এখনো বাকি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিপিপি প্রণয়ন, অর্থায়ন নিশ্চিতের কাজ বাকি। এর পর প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদন পেলে দরপত্রের দীর্ঘ প্রক্রিয়া বাকি থাকবে। অন্তত বছর দুয়েক লাগবে এতে। সড়ক নির্মাণের কাজ শুরুর পর কমপক্ষে আরও বছর দুই লাগবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সওজের প্রেজেন্টেশন অনুযায়ী, ইনার সার্কুলার রুট সব মিলিয়ে ২২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হবে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আদলে চার লেনের মূল সড়কের দুই পাশে থাকবে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য পৃথক লেন। মূল সড়কে উভয়মুখী ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রশস্ত ডাবল লেন থাকবে। মূল সড়কের দুই পাশে দেড় মিটার চওড়া শোল্ডার থাকবে। এর পর থাকবে ধীরগতির যান চলাচলে ৬ দশমিক ২ মিটার চওড়া সড়ক। সড়কের দুই পাশেই সার্ভিস লেনের পর তিন মিটার করে জায়গা খালি রাখা হবে। এক পাশে ১০ মিটার জায়গা খালি রাখা হবে ভবিষ্যতে মেট্রোরেল নির্মাণে।