পুরাতন অকেজো ও অলাভজনক আখ্যা, কেজি দরে বিক্রি ১৯ নৌযান

কেজি দরে বিক্রির অপেক্ষায় উপকূলীয় রুটে চলাচলকারী দুটি সি-ট্রাক। দর প্রতি কেজি মাত্র ২৫ টাকা। শিগগির জাহাজ দুটি (সি-ট্রাক) বিক্রির জন্য টেন্ডার আহ্বান করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এ দুটি জাহাজ ‘স্ক্র্যাপ’ বা ভাঙারি হিসেবে বিক্রির তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ জাহাজ দুটির আয়ুষ্কাল ধরা আছে ২৫ বছর।শুধু এ দুটি জাহাজ নয়, স্ক্র্যাপ হিসেবে সব মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের ১৯টি জাহাজ চলতি বছরেই বিক্রির জন্য তালিকায় রেখেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে তেলবাহী জাহাজ ৫টি। ইতোমধ্যে ৫টি জাহাজ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। জাহাজগুলো বিক্রিতে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা ও দর কোনোটিই পায়নি সংস্থাটি। বিক্রির কারণ হিসেবে ‘পুরাতন, অকেজো ও অলাভজনক’ আখ্যায়িত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিআইডব্লিউটিসির বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে থাকা ৫৭টি নৌযানের তালিকা সম্প্রতি হালনাগাদ করা হয়েছে। তালিকায় দেখা গেছে, বছরের পর বছর ডকইয়ার্ডে বেশ কিছু নৌযান পড়ে আছে; যেগুলোর মধ্যে নতুন জাহাজও রয়েছে। এর একটি হচ্ছে সি-ট্রাক শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত। মাত্র ১০ বছর বয়সী এ জাহাজটি ২০১৭ সালের ২১ অক্টোবর থেকে ভারি মেরামতের জন্য নারায়ণগঞ্জের পোতাঙ্গন ডকইয়ার্ডে রয়েছে।

এ ছাড়া গত কয়েক মাস ধরে পড়ে আছে ফেরি কিষানি, রজনীগন্ধা, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ও বীরশ্রেষ্ঠ মো. রুহুল আমিন। ৫৭টির মধ্যে বেশ কিছু জাহাজ বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ একের পর এক প্রকল্প নিয়ে জাহাজ নির্মাণ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান খাজা মিয়া যুগান্তরকে বলেন, বিক্রির তালিকায় থাকা জাহাজগুলোর অবস্থা এতই খারাপ যে, স্ক্র্যাপ হিসেবে ভেঙে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। এ কারণে আমরা বুক ভ্যালু (জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত খরচ ধরে হিসাব) নয়, স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করছি। তিনি বলেন, যে দর ধরা হয়েছে সেটিও সরকার নির্ধারণ করে দেয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অয়েল ট্যাংকারগুলো সিঙ্গেল বাটমের (নিচতলা এক স্তরবিশিষ্ট) হওয়ায় আইন অনুযায়ী সেগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে জলযানগুলো বিক্রি করতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ১০ বছর আগে নির্মাণ করা জাহাজের অবস্থাও ভালো নয়। বেশ কিছু জাহাজ বছরের পর বছর ডকইয়ার্ডগুলোয় নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। নির্মাণ ত্রুটির কারণে যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি বাঙালি ও মধুমতি লাভের মুখ দেখছে না। এ দুটি জাহাজের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি।

এ কারণে নতুন জাহাজ বেশিরভাগ সময় বসিয়ে রাখা হয়। পুরনো জাহাজে যাত্রীসেবা দিচ্ছে বিআইডব্লিউটিসি। সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, প্রকল্প গ্রহণে অদূরদর্শিতা, ঠিকাদারদের পরামর্শে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অনিয়ম, অপারেশন ও মেরামতে অনিয়মের কারণে জাহাজগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে। এতে সংস্থার অনাকাক্সিক্ষত ব্যয় বাড়ছে। অর্থ সংকটের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তারা বলেন, সংস্থার অর্থ সংকট তৈরি হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

জানা যায়, বিক্রির তালিকায় থাকা জাহাজের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫টি বিক্রি হয়েছে। বাকি ১৪টি বিক্রির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এরমধ্যে সি-ট্রাক রূপালীসহ তিনটি। তেলবাহী জাহাজের মধ্যে রয়েছে: টি-১০৫১, টি-১০৫২, টি-১০৫৫, টি-১০৫৭ ও টি-কালিন্দি। বাকিগুলো হল: ফ্লাট ফেরি-থোবাল, টাগবোট এমভি-ইরান, ক্রেন বোট এমএল ব্রেসে, বিবি-১১২৬ ও অন্নতরী-২।

বিক্রির তালিকায় থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে কম বয়সী দুটি সি-ট্রাক রয়েছে। কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড ২০০১ সালের ডিসেম্বরে এ দুটি নির্মাণ করে। এ দুটি সি-ট্রাক নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে।

একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাধারণত উপকূলীয় রুটে চলা জাহাজের আয়ুষ্কাল ২৫ বছর হলেও এ দুটি জাহাজ ১৫ বছর চলেছে। দুটি জাহাজই কম-বেশি ৫ বছর ধরে নষ্ট পড়ে আছে। এখন জাহাজগুলোকে ভাঙারি (স্ক্র্যাপ) হিসেবে কেজি দরে বিক্রির জন্য তালিকায় রাখা হয়েছে। তারা বলেন, বিআইডব্লিউটিসির প্রকৌশল বিভাগের অনিয়ম ও দুর্বলতার ফল এসব জাহাজ।

একইভাবে টিপি-২ নামের জলযান ২০০০ সালে নির্মাণ করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে চাহিদা না থাকার কারণ দেখিয়ে এ নৌযানটি পাঁচ বছর ধরে চট্টগ্রামে চড়াবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকায় হালের বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে গেছে। এ জাহাজটি কেএম মেরিন নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা সম্প্রতি কিনে নিয়েছে।

আরও জানা যায়, বিক্রির জন্য অপেক্ষায় থাকা পাঁচটি অয়েল ট্যাংকার টি-১০৫১, টি-১০৫২, টি-১০৫৫, টি-১০৫৭ ও টি-কালিন্দি ২০১৭ সালেও ভাড়ায় তেল বহন করত। এতে সংস্থা আর্থিকভাবে লাভবান হতো। এসব জাহাজের বয়স ৪০ বছরের বেশি ও সিঙ্গেল বটাম (জাহাজের নিচের অংশ এক স্তরবিশিষ্ট) হওয়ার কারণ দেখিয়ে পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন তেল দেয়া বন্ধ করে দেয়।

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসের মধ্যে পাঁচটি তেলবাহী জাহাজের সব কটি বিআইডব্লিউটিসির ডকইয়ার্ড বাংলা ঘাটে ফেরত আসে। তিন বছর ধরে ওই ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে এসব তেলবাহী জাহাজ।

এ ছাড়া বিক্রির জন্য থাকা ফ্ল্যাট ফেরি-থোবাল, টাগবোট এমভি-ইরান ও ক্রেন বোট এমএল ব্রেসে ৩০ বছর বা তার বেশি পুরনো। থোবাল, ব্রেসেসহ কয়েকটি জাহাজ ডুবন্ত অবস্থায় আছে। এ কারণে নদীতে নাব্যতা সংকট তৈরি হচ্ছে জানিয়ে জাহাজগুলোকে অপসারণে বিআইডব্লিউটিসিকে চিঠিও দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

দর ও ক্রেতা পাচ্ছে না বিআইডব্লিউটিসি : চলতি অর্থবছরের শুরুতে ৭টি নৌযান বিক্রির টেন্ডার করে বিআইডব্লিউটিসি। নৌযানগুলো হচ্ছে : অন্নতরী-২, অন্নতরী-৬, অন্নতরী-৯, বিবি-১১২৬, ফেরি-যশোর, এসটি মিতালি ও টিপি-২।

এর মধ্যে ৪টি নৌযানের টেন্ডারে একটি করে ও একটি টেন্ডারের বিপরীতে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সব কটি প্রতিষ্ঠানই স্ক্র্যাপের নির্ধারিত দরের সামান্য বেশি দর দিয়েছে। বাকি দুটি নৌযানের একটি অন্নতরী-২ নৌযান কেনার টেন্ডারে কেউ অংশ নেয়নি। বাকি একটি বিবি-১১২৬ নৌযানের টেন্ডারে একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও নির্ধারিত দরের অনেক কম দর দেয়ায় সেটি বাতিল করা হয়।

সূত্র জানায়, অন্নতরী-৬ নৌযানের সংরক্ষিত দাম ২৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৯০ টাকা নির্ধারিত ছিল। টেন্ডারে অংশ নেয়া একমাত্র প্রতিষ্ঠান কেএম মেরিন ২৭ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছে ৩৬ বছরের পুরনো এ নৌযানটি। একইভাবে অন্নতরী-৯ জাহাজটির দর ২৫ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও সেটিও কেএম মেরিন ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দরে কিনেছে। এসটি মিতালির দর ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭৫ টাকা ধরা হলেও সেটি ৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে।