বঙ্গবন্ধু একটি নাম, একটি ইতিহাস

সম্পাদকীয়ঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ ও ২০২১ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠান ও কর্মসূচী পালন করা হবে দেশব্যাপী। এমনিতে প্রতিবছর জাতির জনকের জন্মদিন উপলক্ষে ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস পালন করা হয়।

বাবা-মা আদর করে ডাকতেন খোকা।এই খোকা একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি বাংলার জাতির পিতা।

এই নাম ও বাংলাদেশ যেন রেললাইনের মতো সমান্তরাল। শেখ মুজিব, খোকা ও বাংলাদেশ সমার্থক শব্দত্রয়। এই শব্দত্রয়ের সঙ্গে অরেকটি শব্দ যোগ হবে সেটি হলো ‘রাজনীতির কবি’। সত্যিকার অর্থেই তিনি একজন কবি। তিনি কবিই যদি না হয় তাহলে বাংলাদেশ নামক লাল-সবুজ কবিতাটি বুনতেন না।

শিশু থেকে দুরন্ত কৈশর। মধুমতির শ্যামল পরিবেশে ঘোলাজলে গাঁয়ের ছেলেদের সাথে সাঁতার কাটা,দৌড়-ঝাপ, দল বেঁধে হা-ডু-ডু, ফুটবল, ভলিবল খেলায় তিনি ছিলেন দস্যি বালকদের নেতা। তখন কে জানত এই দস্যি বালকদের নেতাই একদিন বিশ্বনেতা, বাঙালি জাতির পিতা হবেন?

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ শেখ লুৎফর রহমানের ঔরসে, সায়েরা খাতুনের গর্ভে জন্ম নেয়া হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি খোকা আজ ১০০শত বছরে পা রাখতেন। শ্বেত-শুভ্র চুলে খেলা করত বাংলার মাটি-বাংলার জল। ১৯৭৫ সালে ঘাতকের বুলেট এ জীবন্ত কাব্য থামিয়ে দেয় এই মহানায়ককে। থামিয়ে দেয় বাঙালির অগ্রযাত্রা। তবুও তার কাব্যধারায় স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

মুজিব ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তিনি স্থানীয় গীমাডাঙ্গা স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। চোখের সমস্যার কারণে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা চার বছর ব্যাহত হয়।

১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনিস্টিউট মিশন স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই পাশ করেন প্রবেশিকা। ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.এ এবং একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বি.এ পাশ করেন।

এই স্কুলে থাকাকালীন সময়েই তাঁর প্রতিভা আর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। এমনিতেই ক্লাশের অন্যান্য ছেলেদের চেয়ে কিছুটা বয়সে বড় সেই সাথে তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা সকলকে মুগ্ধ করে। সকলের প্রিয় পাত্রে পরিণত হন তিঁনি। তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে ‘মুজিব’ ভাই হিসেবে।

স্কুল জীবনেই শেখ মুজিব প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। প্রথম মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার হন স্কুল জিবনেই। তারপর ধাপে ধাপে বাঙ্গালীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বহুবার কারাবরণ করেছেন।কিন্ত মাথা নত করেনি।

পরিবারের সবাই ‘খোকা’ নামে ডাকতেন। কেউ কি ভেবেছিল শেখ পরিবারের আদরের ছোট্ট খোকা একদিন বিশ্বনন্দিত নেতা হবেন কিংবা স্বাধীনতায় নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ত্রাণকর্তা? গভীর দেশপ্রেম, সীমাহীন আত্মত্যাগ ও অতুলনীয় নেতৃত্বে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তার বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলার শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে নেতৃত্বের জন্য জনগণ তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে তার সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, জেল-জুলুম, নির্যাতন-কারাবন্দির কারণে ইতিহাসে তাকে জাতির পিতার অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়।

খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পিছনে যে ইতিহাস সেটার পিছনে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিলো তাঁর অদম্য নেতৃত্ব আর ত্যাগ।

স্বনামধন্য লেখক আহমদ ছফা তার শেখ মুজিবুর রহমান নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান এ দুটো যমজ শব্দ, একটা আরেকটার পরিপূরক এবং দুটো মিলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্বল-প্রোজ্জ্বল এক অচিন্তিত পূর্ব কালান্তরের সূচনা করেছে।’

সেদিনের ছোট খোকার বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে। এসবের মাঝে একটি ঘটনা সব বদলে দেয়। কবি নির্মলেন্দু গুণ তার ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় লিখেন, ‘‘একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল/প্রতীক্ষা মানুষের : কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?/শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/তখন পলকে দারুুন ঝলকে তরীতে উঠিল জল,/হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার/সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকন্ঠ বাণী?/গণসূয্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি/‘এবারের সংগ্র্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। /সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’’

আঙুল উচিয়ে সেদিনের সেই অমর কবিতা গেয়ে বাংলার ঘরে স্বাধীনতা এনে দেন সেই খোকা নামের শেখ মুজিব। খোকার অলিখিত কবিতা পাঠের ফসল বাংলার মুক্তি ও স্বাধীনতা।

অথচ প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। বহু বছরের শোষণ-বঞ্চনা-অবহেলার ফলে বাঙালি পাকিস্তানিদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেই সময়ে একজন জীবন্ত রাজনৈতিক কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। শোনালেন বহু কাঙ্খিত অমর বাণী।

তিনি সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি সমেত কোট গায়ে শোনালেন বাঙালির মুক্তির কিছু পঙক্তি। শিহরণ জাগালেন সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ে।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বক্তব্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করা ছিল সুচিন্তিত এবং সমাজ সেবামূলক। স্কুলের ছাত্রত্বকালীন সময়ে তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল উঠিয়ে গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার খরচ বহন করা, বস্ত্রহীন পথচারী শিশুকে নিজের নতুন জামা পরিয়ে দিতেও তিনি কার্পণ্য করতেন না। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের দায়িত্ব নেয়ার মতো মহৎ গুণ শক্তভাবেই ধারণ করেছিলেন সেই শৈশবেই।

১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে সারাদেশে এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, “দিন রাত রিলিফের কাজ করে কুল পাই না। লেখাপড়া মোটেই করি না। কলকতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী। আব্বা একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘বাবা রাজনীতি কর, আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছো, এতো সুখের কথা। তবে লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবা না। আরেকটা কথা মনে রেখ- sincerity of purpose and honesty of purpose থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না’। আব্বার একথা কোনদিন আমি ভুলি নাই”।

পিতা শেখ লুৎফুর রহমানের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ‘দায়িত্বশীলতা’ ও ‘দেশপ্রেম’ এই দুটি শব্দকে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত করেছেন পুরো জীবনে। পরাধীন দেশকে ও দিশাহীন জাতিকে লক্ষ্যস্থীর করতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রশংসার দাবিদার।

অসীম সাহসিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্র্রতিবাদ করতে ভয় পেতেন না বঙ্গবন্ধু। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি বলেন, “ছাত্রলীগের বাৎসরিক সম্মেলন হবে ঠিক হল। বহুদিন সম্মেলন হয় না। কলকাতায় আমার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল- বিশেষ করে ইসলামিয়া কলেজে কেউ আমার বিরুদ্ধে কিছুই করতে সাহস পেত না। আমি সমানভাবে মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগে কাজ করতাম। এই সময় একদিন শহীদ সাহেবের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়। তিনি আনোয়ার সাহেবকে একটা পদ দিতে বলেন, আমি বললাম, কখনোই তা হতে পারে না। সে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোটারি করেছে, ভাল কর্মীদের জায়গা দেয় না। কোনো হিসাব-নিকাশও কোনোদিন দাখিল করে না। শহীদ সাহেব আমাকে হঠাৎ বলে বসলেন, who are you? you are nobody. আমি জবাবে বললাম – If I am nobody, then why you have invited me? you have no right to insult me. I will prove that I am somebody. Thank you sir. I will never come to you again একথা বলে চিৎকার করতে করতে বৈঠক ছেড়ে বের হয়ে এলাম”।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, বাঙালি জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার আহ্বান জানান। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” একটানা নয় মাস চলে যুদ্ধ। নয় মাসের যুদ্ধের পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন জাতির জনক। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পূনর্গঠনে তিনি মনোনিবেশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অন্যান্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বার বার জেল খেটেছেন। ফাঁসির মঞ্চে নিয়েও তাকে মারতে পারেনি পাকিস্তানিরা। বাঙালি জাতি ও বিশ্ববাসীর চাপে কারগার থেকে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তানিরা । সেই নেতা, সেই পিতা, সেই মহানায়ককে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশের সেনাবাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্য স্ব-পরিবারে হত্যা করলো। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অনেক আগেই দেশটা হত স্বপ্নের সোনার বাংলা।

বঙ্গবন্ধু তার ৫৫ বছরের আয়ুষ্কালের মধ্যে ৩৫ বছরে রাজনীতি এবং সংগ্রামী জীবনের যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, তা বাঙালি জাতির হৃদয়ে বহতা নদীর মতোই বইতে থাকবে দীর্ঘকাল।

মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর ৩৫ বছরে রাজনৈতিক জীবনের ২৩ বছর (১৯৪৮-৭১) কেটেছে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ এবং সামরিক শাসনের নামে নব্য ঔপনিবেশিকতার হাত থেকে এ দেশের সাত কোটি বাঙালিকে মুক্তি দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে, আন্দোলন এবং সংগ্রামে।

মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৪ দিন ছিলেন যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের শাসনকর্তা। ইতিহাস সত্যের পথে অবিরল, অবিচল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর নাম চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

কিন্তু ব্যর্থ হয়ে খুনিরা ইতিহাসের আঁস্তকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ৪৪ বছর পরেও খুনিদের ফাঁসির কাঠ গড়ায় ঝুলতে হয়েছে।

সময় চলে তার নিজ গতিতেই। অনুরূপভাবে সময়ের বিবর্তনে সৃষ্টি হয় ইতিহাস। আবার ইতিহাস সৃষ্টির প্রয়োজনেই পৃথিবীতে কিছু মানুষের আগমন কিংবা প্রস্থান। বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু একই সূত্র গাথা যা কখননোই আলাদা করার নয়।

মার্চ মাস একটি ঐতিহাসিক মাস। এই মাসেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। জাতির জনকের জন্ম নেয়া এ মহেন্দ্রক্ষণটি জাতীয় শিশু দিবস। আবার এই মাসেই তিনি জাতিকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই মাসেই তিনি নিজেদের একটি স্বাধীন ভূখন্ডের জন্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

এইমাস বাঙালি জাতির জীবনে এক আনন্দের দিন। কিছুটা দুঃখেরও। এমন দিনে বড় বেশি কানে বাজে, বাঙালি অকৃতজ্ঞ।

ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য যে, জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ তথা মুজিব বর্ষ উদযাপিত হতে যাচ্ছে তাঁরই কন্যার হাত ধরে। অতঃপর জাতির জনকের প্রজ্বলিত দীপ্ত শিখা তথা সমুজ্জ্বল আলো পৌঁছে যাক বাংলার ঘরে ঘরে, মাঠ-ঘাট প্রান্তরে, আকাশে-বাতাসে সর্বত্র এই আমাদের প্রত্যাশা।